কার্তিকের কুয়াশা

অ্যান্টিপার্টিকেল গেইট
নুরুল আজম
অ্যাপার্টমেন্টের গ্রাউন্ড ফ্লোরে নেমে এল নিশাত।লিফট থেকে নেমে বিভ্রান্ত হয়ে পড়ল সে।প্রতিদিন এমন হয়।একিই নিয়ম,উদ্দেশ্যহীন ভাবে ঘুরে বেড়ানো। গবেষণা ছেড়ে দেওয়ার পর থেকে পৃথিবীটা যেন জেল এর মত হয়ে গেছে। তবে এই জীবনটা তেমন খারাপ নয়।পৃথিবীতে উপভোগ করার মত অনেক কিছু আছে, ধীরে ধীরে সেটা বুঝতে শুরু করেছে সে।
সামনের দোকানটা তে ছোটখাট ভিড়।একটা মানুষকে দোকনে ঢুকতে দিচ্ছেনা নিরাপত্তা রোবট। নিশাত দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কিছুক্ষন দেখল, তারপর আবার হাঁটা শুরু করল।
কিছু দিন আগেই রোবটের দুনিয়ায় ডুবে থাকত নিশাত আর এখন রোবট দেখলেই বিরক্ত লাগে।
মাঝে মাঝে এই রোবটগুলো মজার মজার কান্ড করে। আসলে আর্টিফেশিয়াল ইন্টিলিন্জেন্সি এখনো পরিপূর্নতা পায়নি। পাবেও না। রোবট কি মানুষের সমান হতে পারবে?
অবশ্য সাধারণ মানুষরা এই সব বোঝে না ।
বুঝলে রোবট সমাজের বিশাল ক্ষতি হয়ে যেত। একটা রোবটকে হ্যাক করে দোকানে ঢুকা এমন কোন কঠিন ব্যাপার নয়, শুধু মাএ এমন কিছু বলতে হত যার সাথে রোবটি পরিচিত নয়। তার বদলে লোকটা রোবটির সাথে তর্ক শুরু করে দিল!
নিশাত রোবটের কপোট্রন হ্যাক করে বেশ মজা পায়। আজ সেই রকম কিছু করার জন্য ইচ্ছে হচ্ছে তার। তবে এইসবে ঝামেলাও কম নয়। রোবট গুলা ছবি রেকর্ড করে রাখে, পরে এলগরিদম অটো চেন্জ করে নেয়। আর রিপোর্ট পাঠিয়ে দেয় বিজ্ঞান পরিষদে। ওরা এসে হাবিজাবি বলে কিন্তু কিছু করতে পারে না, কারন পরোক্ষভাবে এতে তাদের উপকার হয় আর কি...
ভয়ংকর অপরাধীরা এই সব চিটের খবর পেলে বারোটা বেজে যেত বিজ্ঞান পরিষদের।
এই নিশাত,দাঁড়াও!
কে যেন ডেকে উঠল পেছন থেকে।
সম্ভবত ইমা....হুম, ইমাই তো।
ইমাকে দেখলে নিশাতের মন কেমন যেন করে উঠে। জীবনের ভালো সময়গুলোর বেশির ভাগই তার সাথে কাটানো। কত বার যে ভালো লাগার কথা বুঝাতে চেয়েছে নিশাত, কিন্তু ইমা এড়িয়ে যেত বার বার।
অনেক বার মনে হয়েছে ইমা তাকে পছন্দ করে, কিন্তু কোথায় যেন সমস্যা আছে...
নিশাত বুঝেছে নিজের সমস্যা কি। এজন্য এখন আর চেষ্টা করে না।
নিশাত তোমার যোগাযোগ মডিউল বন্ধ কেন?
তুমি এখানে আমাকে খুঁজে পেলে কিভাবে?
সেটা পরে বলব।তুমি কি জানো কি হয়েছে?
কি হয়েছে?
মডিউল টা চালু কর তাহলেই বুঝতে পারবে।
মহাকাশে জেমিনি অঞ্চলে অদ্ভুত ব্যাপার লক্ষ্য করা গেছে।ওখান থেকে নিরবিচ্ছিন্ন ভাবে অ্যন্টিপার্টিকেল এর স্রোত বয়ে যাচ্ছে।জায়গাটাতে কিছুই নেই অথচ প্রচন্ড শক্তি নিয়ে কনা গুলো বের হচ্ছে। এরই মধ্যে স্যাটেলাইট গুলো ম্যাল-ফাংশন করা শুরু করেছে।যদিও এখনো তেমন কিছু হয়নি,তবে পৃথিবীর যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙ্গে পড়তে পারে। সাধারন মানুষ এখনো তেমন কিছু জানে না, কারন তাদের জানানো হয়নি। ল্যাবে গেলে তুমি বুঝতে পারতে ব্যাপারটা।
নিশাত আনমনে কিছু একটা বলে থেমে গেল।
ও, হ্যাঁ এই মেমোরি কার্ডটা রাখ,একটা ফাইল আছে রিডারে পড়ে নিও। পরে তোমার সাথে যোগাযোগ করব।
ইমা যেমন দ্রুত এসেছিল তেমন করেই চলে গেল।
নিশাত রুমে ফিরে এসে কমিউনিকেশন মডিউল টা চালু করল। এতক্ষন পরিবেশটা স্বাভাবিক মনে হলেও এখন তা মনে হচ্ছে না। নিরাপত্তা পরিষদ থেকে আসা একটা তড়িৎবার্তা পড়া শুরু করল নিশাত
............মহাকাশের জেমেনি এলাকায় অ্যান্টিপার্টিকেল স্রোতের অস্তিত্ব পাওয়া গেছে।আমরা নিশ্চিত হতে পারছিনা উৎস সম্পর্কে।পার্টিকেলগুলোর গতিবেগ ও কোন ভাবে ব্যাখ্যা করা যাচ্ছেনা।শূন্য থেকে কনা গুলো তৈরী হয়ে আলোর চেয়ে বেশী বেগে বেরিয়ে যাচ্ছে....
এখনো কণাগুলোর অভিমুখ আমাদের দিকে না, তবে যে কোন মুহূর্তে কণাগুলো দিক পরিবর্তন করতে পারে। তাছাড়া এন্টিপার্টিকেলগুলো মহাকাশ দূষন ঘটাচ্ছে যেটা আমাদের জন্য বিশাল হুমকি। ব্যাপারটা পর্যবেক্ষন করার জন্য মহাশূন্যে এক দল বিজ্ঞানী পাঠানো হবে। আপনাকে সেই দলে প্রাথমিক ভাবে মনোনয়ন দেয়া হয়েছে। আপনি যদি রাজী থাকেন তাহলে নিরাপত্তা পরিষদের সাথে যোগাযোগ করতে অনুরোধ করা হচ্ছে... "
নিশাত ভাবল তার অনুমানটা শেষ পর্যন্ত সত্য হতে চলেছে। অ্যান্টিপার্টিকেলের বেগ নিয়ে একটা গবেষণাপত্র আছে তার।সে মনে মনে ব্যাপারটা সাজাতে শুরু কারল;
....ঘটনাটার ব্যাখ্যা দেওয়া যায় যদি মানে করা হ্য় কণাগুলো প্রতি বিশ্ব থেকে আসছে...
অ্যান্টিপার্টিকেলগুলোর বেগ সত্যিকার অর্থে আলোর বেগের সমান।কিন্তু A-ট্রান্সফর্মের জন্য আপাত বেগ বেশী মনে হচ্ছে।
নিশাত দ্রুত হিসাব করতে থাকল; অ্যান্টিপার্টিকেলের গতি বিশ্লেষণ করে সে প্রতিবিশ্বের কোঅর্ডিনেট বের করল।
একটি নক্ষত্রের বিস্ফোরন ঘটেছে প্রতিবিশ্বে। এমনভাবে বিস্ফোরন টা হয়েছে যে ,তার অ্যান্টি-অর্ডিনেট আমাদের কাছাকাছি। প্রচন্ড শক্তি ক্ষয়ের ফলে স্পেস ছিন্ন ভিন্ন হয়ে জেমেনি অঞ্চলে সৃষ্টি হয়েছে একটা স্টার গেইটের। এই গেইট দিয়ে কণাগুলো আমাদের বিশ্বে চলে আসছে।
অ্যান্টিপার্টিকেল পৃথিবীর দিকে ধেয়ে আসেলে কি হবে তা ভেবে শিউরে উঠল নিশাত। কণা ও প্রতিকণা মিলে ভয়ংকর শক্তিতে মিলিয়ে যাবে। পৃথিবী নামক গ্রহটি মুছে যাবে মহাবিশ্বের ইতিহাস থেকে।
অভিযাত্রিক দলে নাম লিখিয়ে ফেলে সে। ইমাকে জানালো নিশাত।
ইমা বলল তুমি যাবে কেন? তুমিতো এস্ট্রোনট নও।
ব্যাপারটা তুমি বুঝছনা, কেন? পৃথিবী থেকে এই কাজ করা কঠিন হবে।তাছাড়া এই ব্যাপারটা পৃথিবীর অস্তিত্ব নিয়ে।
তুমি কি কার্ডটা রিডারে দেখছ?
না,কি আছে ওতে" বলল নিশাত।
ওটা তোমার সাথে রেখো।
মহাকাশযান অ্যান্টি-অবর্জাভার যাত্রা শুরু করে মহাকাশের জেমেনির দিকে।বিজ্ঞানীরা নিখুঁত ভাবে পর্যবেক্ষণ করতে লাগল জেমেনির অ্যান্টিপার্টেকেল সোর্সকে।তারা অবাক বিস্ময়ে আবিষ্কার করল নিশাতের পেপারটা পুরোপুরি নির্ভুল।
স্টার গেইটির এরিয়া বাড়ছে ধীরে ধীরে, খুব তাড়াতাড়ি ওটাকে ব্লক না করলে পৃথিবীর জন্য ভয়ানক পরিণতি অপেক্ষা করছে সামনে।
অ্যান্টি-অবর্জাভারে ক্রুদের নিয়ে একটা মিটিং ডাকা হয়। ক্যাপ্টেন রিওন বলল, স্টার গেইটটি বন্ধ করার সমাধান আমাদের সবার ই জানা, ওখানে ভয়ংকর বিস্ফোরন ঘাটাতে হবে ।কিন্তু বিস্ফোরকগুলোকে কাউকে না কাউকে নিয়ে যেতে হবে ঐ জায়গাতে, কারন ওখানে রোবট মডিউল পাঠালে সেটা যে কোন সময় নিয়ন্ত্রন হারাতে পারে।
নিশাত বুঝে গেল তাকে কি করতে হবে।সে রাজি হয়ে গেল বিস্ফোরক গুলো নিয়ে যেতে।
এই মুহূর্তে ইমার কথা মনে পড়ল নিশাতের। জীবন আসলে বিচ্ছিন্ন কিছু নয়। ভালোবাসাকে তখনই অনুভব করা যায় যখন একে রক্ষা করার সময় চলে আসে। মিটিং এ সবাই দাঁড়িয়ে শ্রদ্ধা জানালো নিশাতের প্রতি।
একটা স্কাউটশীপ আলাদা হয়ে পড়েছে মহাকাশযান অ্যান্টি-অবর্জাভার থেকে।স্কাউটশিপে নিশাত ছুটে যাচ্ছে জেমিনির দিকে।ইমার দেয়া কার্ডটির কথা মনে পড়ল নিশাতের।
রিডারে কার্ডটি ঢুকাতেই স্ক্রিনে ইমার মুখটি ভেসে উঠল, নিশাতের চোখ ভারী হয়ে উঠল।
নিশাত তোমার কি মনে আছে? কবে আমাদের দেখা হয়েছিল প্রথম?
তুমি হয়তবা সব ভুলে যাও,কিন্তু আমার মনে আছে। (ঐদিনের কথা মনেপড়ল নিশাতের, টিশার্ট উল্টা করে পড়েছিল সেইদিন। কেউ বলে দেইনি ওটা, অথচ ঐ ইউনিটে প্রথমদিন ছিল ইমার।)
তোমার টিশার্ট ঠিক করার জন্য বললাম, আর তুমি কেমন চমকে উঠলে।
তারপর থেকে আমাদের পরিচয়, তুমি কি জানো?
তোমার সাথে সময় কাটানো কত টা উপভোগ করতাম আমি!
ল্যাবের ক্যাফেতে কাটানো সময়গুলো?
পরের দিকে হয়তবা ভুল বুঝাবুঝি হয়েছে, হঠাৎ তুমি অন্যরকম হয়েগেলে, ল্যাব ছেড়ে দিলে।আমার সাথে যোগাযোগও কমিয়ে দিলে...কেন এমন করলে?
তোমাকে এড়িয়ে চলতাম বলে? তুমি কি কখনো সরাসরি আমাকে বলেছ তোমার ভালো লাগার কথা?
তুমি কি জান কতটা ভালোবাসি তোমাকে!
নিশাত কান্না থামিয়ে রাখতে পারলনা...
ক্যাপ্টেন রিওন বলছি"আমার যদি ভুল না হয়ে থাকে, তুমি আমার কথা শুনতে পাচ্ছ নিশাত।তুমি ২০ মিনিটের মধ্যে জেমিনি রেডিয়েশন কোরে ঢুকে পড়বে।তোমার কিছু বলার থাকলে বলতে পার"
নিশাত কোন জবাব দিল না...
অদ্ভুত এক মায়া গ্রাস করে ফেলে নিশাতকে ।তারপর প্রচন্ড বিস্ফোরণে নিশাত মিলিয়ে গেল মহাশূন্যের অসীমতায়।
পৃথিবী থেকে দেখা গিয়েছিল সেই বিস্ফোরণটি।ইমা অপলক চোখে শুধু চেয়েছিল।পৃথিবীতে নেমে এল বৃষ্টি, প্রচন্ড বৃষ্টিতে ইমার বিন্দু বিন্দু চোখের জ্বল চলে গেল সাগর থেকে মহাসাগরে....